রমজানের ফজিলত ও আমল

আপনি পবিত্র মাহে রমজানের ফজিলত ও আমল এ ব্যপারে জানতে চান ? রমজান মাস। আরবি মাস সময়ের মধ্যে সবচেয়ে বরকতময় ও মর্যাদাপূর্ণ মাস। এই মাসের গুরুত্ব ও বৈশিষ্ট্য অপরিসীম।

পবিত্র রমজান অফুরন্ত রহমত ,বরকত, কল্যাণ ও মঙ্গল পূর্ণ মাস। জাগতিক লোভ লালসা, হিংসা বিদ্বেষ, প্রবৃত্তির অনুসরণ ইত্যাদি মানবিক দুর্বলতা থেকে দূরে থেকে আত্ম সংশোধনের মাধ্যমে খোদায়ী গুণাবলী অর্জনের অবারিত সুযোগ এনে দেয় পবিত্র মাহে রমজান।

পবিত্র মাহে রমজান মাস মুমিনের জীবনের সেরা মাস। জীবনের সব গুনাহ থেকে পরিত্রান ও পবিত্র হওয়ার সুবর্ণ সময়।

রমজান মাসের প্রতিটি মুহূর্ত মানব জীবনের সেরা সময়। আল্লাহর কাছে আনুগত্য ও নেকি বৃদ্ধির মাধ্যমে নিজেকে উৎসর্গ করার মাস হল রমজান মাস।
পবিত্র রমজানের ফজিলত ও আমল অন্য মাসের তুলনায় অনেক বেশি।

রমজানের ফজিলত
রমজানের ফজিলত

কোরআন হাদিসের আলোকে রমজানের ফজিলত

রোজার সংজ্ঞা:

আল্লাহ সুবহানাহুওয়া তা’আলার নৈকট্য অর্জনের উদ্দেশ্যে, সুবহে সাদিক অর্থাৎ সেহরির শেষ ও ফজরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার সময় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার, সহবাস ও রোজা ভঙ্গ কারি যাবতীয় কাজ থেকে বিরত থাকাকে রোজা বলে।

রোজা যাদের উপর ফরজ

প্রত্যেক মুসলিম প্রাপ্তবয়স্ক (বালেগ), সুস্থ বিবেক বুদ্ধি সম্পন্ন, মুকিম (নিজ বাসস্থানে অবস্থানকারী) নারী পুরুষ এর ওপর রোজা ফরজ।

নিয়ত করা

রোজার জন্য নিয়ত করা ফরজ। রোজা শুদ্ধ হওয়ার জন্য সর্ব প্রথম শর্ত হলো নিয়ত করা। শুধু রমজান মাসের রোজা নয়, প্রত্যেক রোজা শুদ্ধ হওয়ার জন্য নিয়ত করা শর্ত। নিয়ত ব্যতীত সারাদিন পানাহার যৌনতৃপ্তি দেখে বিরত থাকলেও রোজা হবে না।

মুখে নিয়ত করা জরুরি নয়। অন্তরে নিয়ত করলেই যথেষ্ট হবে, তবে মুখে নিয়ত করা উত্তম। নিয়ত আরবিতে করা শর্ত নয়।

নিয়ত করার ক্ষেত্রে এভাবে বলবেন: আমি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার সন্তুষ্টির জন্য আজকে ফরজ রোজা রাখার নিয়ত করলাম। নফল রোজা রাখার ক্ষেত্রে নফল, ওয়াজিব রোজার ক্ষেত্রে ওয়াজিব নিয়ত করবেন।অর্থাৎ এভাবে বলবেন আমি আজকে নফল রোজা রাখলাম।

সেহরি

সেহেরী খাওয়া সুন্নত। এছাড়া অনেক ফজিলত পূর্ণ একটি আমল। ক্ষুধা না লাগলে‌‌ অথবা খেতে ইচ্ছা না করলেও অত্যাধিক ফজিলত এর আশায় সামান্য কিছু খাওয়া উত্তম। বিলম্বে সেহরি খাওয়া উত্তম। তবে সেহরি না খেলে , রোজা শুদ্ধ হবে না বিষয়টি এমন নয়। সেহরি না খেলে রোজা শুদ্ধ হবে।

ইফতার

ইফতার করা মুস্তাহাব। সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর বিলম্ব না করে তাড়াতাড়ি ইফতার করা মুস্তাহাব। বিলম্বে ইফতার করা মাকরুহ।

তবে সূর্য অস্ত যাওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার পর‌ই ইফতার করতে হবে। ইফতারের পূর্ব মূহুর্তে দোয়া করা মুস্তাহাব। ইফতারের সময় দোয়া কবুল হয়।

ইফতার করার ক্ষেত্রে সর্বোত্তম খাবার হল খেজুর। রোজা আদায়কারী ব্যক্তি কে ইফতার করানো মুস্তাহাব।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন-রোজাদারের খুশির বিষয় 2 টি : যখন সে ইফতার করে তখন একবার খুশির কারণ হয়।

আর একবার যখন সে তার রবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে রোজার বিনিময়ে লাভ করবে, তখন খুশির কারণ হবে। ( বোখারী)

রোজাদারকে ইফতার করানো:

রমজানের ফজিলত হলো রোজাদারকে ইফতার করানো । হাদিস হলো :

হযরত সালমান রা. থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন- যে রমজান মাসে কোন রোজাদারের ইফতারের ব্যবস্থা করবে, তবে সেটা তার পাপ মোচন ও জাহান্নাম থেকে মুক্তির কারণ হবে এবং রোজাদারের প্রতিদানের কোন অংশ কমানো ব্যতিরেকে সেই রোজাদারের সমান প্রতিদান পাবে।

সাহাবীরা বলে উঠলেন- ইয়া রাসুলুল্লাহ! ইফতার করার মত সামর্থ্য তো আমাদের সবার নেই। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন-যারা সামান্য দুধ বা একটি খেজুর কিংবা এক ঢোক পানি দেয়া হলোও কোন রোজাদারকে ইফতার করাবে, আল্লাহ তাআলা তাদের কেও এই সাওয়াব দিবেন। সুবহানাল্লাহ ( বায়হাকি ও ইবনে খুযাইমা)

কোরআন হাদিসের আলোকে রমজানের ফজিলত

এখানে রোজার ফজিলত বর্ণনা করা হবে কোরআনও হাদিস থেকে । এক হিসেবে দলিল বর্ণনা করা । আশাকরি আপনারা ভালভাবে বুঝতে পারবেন।

কোরআনের আলোকে রোজার ফজিলত:

১/ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা পবিত্র কুরআনুল কারীমের সূরা বাকারার 185 তম আয়াতে বলেনঃ

রমজান মাস‌ই হল সেই মাস, যাতে নাযিল করা হয়েছে কোরআন, যা মানুষের জন্য হেদায়াত এবং সত্য পথ যাত্রীদের জন্য সুস্পষ্ট পথ নির্দেশ আর ন্যায় ও অন্যায়ের মাঝে পার্থক্য বিধানকারী।

তোমাদের মাঝে যে সকল মাসটি পাবে, সে এই মাসের রোজা রাখবে। আর যে সকল লোক অসুস্থ কিংবা মুসাফির অবস্থায় থাকিবে সে অন্য দিনের গণনা পূর্ণ করবে।

আল্লাহ সুবহানাহুওয়া তা’য়ালা তোমাদের জন্য সহজ করতে চান; তোমাদের জন্য জটিলতা কামনা করেন না, যাতে তোমরা গণনা পূর্ণ করো এবং তোমাদের হেদায়েত দান করার দরুন আল্লাহ তাআলার মাহাত্ম্য বর্ণনা করো, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার করো।

২/ রমজানের ফজিলত এর ব্যপারে আল্লাহ সুবহানাহুওয়া তা’য়ালা কোরআনুল কারিমের অপর এক আয়াতে বলেন:

হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরয করা হয়েছে। যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর ফরজ করা হয়েছিল। নিঃসন্দেহে তোমরা (এই রোজার মাধ্যমে) মুত্তাকী (খোদাভীরু) হতে পারবে।

(সূরা বাকারা আয়াত নাম্বার 183)

রমজানের ফজিলত সম্পর্কে হাদিস

রমজানের ফজিলত সম্পর্কে হাদিস
রমজানের ফজিলত সম্পর্কে হাদিস

১/ যখন পবিত্র মাহে রমজান মাসের আগমন হত তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অতিশয় আনন্দিত হতেন, এবং তার সাহাবীদের বলতেন:

اتاكم رمضان شهر مبارك

তোমাদের নিকট বরকতময় রমজান মাস এসেছে। এরপর তিনি বরকতময় মাসের তিশার ফজিলত বর্ণনা করে বলতেন- আল্লাহ সুবহানাতায়ালা তোমাদের জন্য রোজা পালন করা ফরয করেছেন।

এই মাসে আকাশের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়। বন্ধ করে দেওয়া হয় জাহান্নামের দরজা গুলো। অভিশপ্ত শয়তানকে বন্দি করা হয়। এই মাসে রয়েছে এমন একটি রাত যা হাজার রাতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। যে ব্যক্তি এই কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হল, সে মূলত সকল কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হল। (নাসায়ি)

ইসলামের মৌলিক ভিত্তি পাঁচটি যথা: ১. কালিমা ২. নামাজ ৩. রোজা ৪. হজ্ব ৫. জাকাত। যদি কোন ব্যক্তি এর কোন একটি অস্বিকার করে, সে কাফের হয়ে যাবে। সুতরাং যে ব্যক্তি রোজা অস্বীকার করবে সে কাফের হয়ে যাবে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

২/ যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় একদিন রোজা রাখবে ,আল্লাহতালা সেদিনে পরিবর্তে তার চেহারাকে জাহান্নাম থেকে 70 বছরের দূরত্বে সরিয়ে দেবেন। সুবহানাল্লাহ
( বুখারী -১৯০৪)

৩/ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো এরশাদ করেন: রোজা মানুষের জন্য ঢাল স্বরূপ যতক্ষণ পর্যন্ত তারা ফেরে না ফেলা হয়। ( অর্থাৎ রোজা মানুষের জন্য জাহান্নাম থেকে মুক্তির কারণ হবে যতক্ষণ পর্যন্ত তা নিয়ম অনুযায়ী পালন করা হয়।) ( নাসাঈ ইবনে মাজাহ )

রমজানের আমল

রোজা রাখা অবস্থায় সবরকমের গুনাহ পরিত্যাগ করা

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ওয়া সাল্লাম বলেছেন

কেউ যদি (রোজা রেখেও) মিথ্যা কথা বলে ও খারাপ কাজ পরিত্যাগ না করে, তবে তার শুধু পানাহার ত্যাগ করা অর্থাৎ উপবাস ও তৃষ্ণার্ত থাকি আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই। বুখারী

ত্রিশ রোজার ত্রিশ ফজিলত

ত্রিশ রোজার ত্রিশ ফজিলত
ত্রিশ রোজার ত্রিশ ফজিলত

প্রথম রমজানে একজন নবজাতকের মত রোজাদারকে নিষ্পাপ করে দেওয়া হয়।

দ্বিতীয় রমজানে রোজাদার ব্যক্তির মা-বাবাকে ক্ষমা করে দেয়া হয়।

তৃতীয় রমজানে আবারও একজন ফেরেশতা রোজাদারের ক্ষমার কথা ঘোষণা দেয়।

চতুর্থ রমজানে আসমানী বড় বড় চার কিতাবের বর্ন পরিমাণ সাওয়াব প্রদান করা হয় একজন রোজাদার ব্যক্তিকে।

পঞ্চম রমজানে মক্কা নগরে অবস্থিত মসজিদে হারামে নামাজ পড়ার বা আদায় করার সাওয়াব প্রদান করা হয়।

ষষ্ঠ রমজানে সত্যম আকাশ অবস্থিত বাইতুল মামুরে ফেরেশতাদের সাথে তাওয়াফের সাওয়াব প্রদান করা হয়।

৭ম রমজানে হযরত মুসা আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পক্ষে ফেরাউনের বিরুদ্ধে সহযোগিতা করার সমান পরিমাণ সাওয়াব প্রদান করা হয়।

অষ্টম রমজানে হযরত ইব্রাহিম আলাই সালাম এর মত একজন রোজাদারের উপর রহমত বর্ষিত হয়।

নবম রমজানে নবী-রাসুলদের সাথে একসাথে দাঁড়িয়ে ইবাদত করলে যে সাওয়াব হয় সে সাওয়াব দেওয়া হয় ।

দশম রমজানে একজন রোজাদার ব্যক্তি কে উভয় জাহানের কল্যাণ দান করা হয়।

পরিশেষে বলব : উপরে রমজানের ফজিলত ও আমল সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো। যদি এই লেখাটি আপনার উপকারে দিয়ে থাকে এবং ভালো লাগে তাহলে অবশ্যই কমেন্ট করে জানাবেন। বন্ধুদের সাথে শেয়ার করবেন। ধন্যবাদ।

আরো পড়ুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published.

five × 3 =